করোনা মোকাবিলাঃ একটি সম্পূরক প্রস্তাবনা

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের কারণে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এই প্রবন্ধটি লিখার সময় পর্যন্ত এই ভাইরাসটি ২১০ টি দেশের অথবা অঞ্চলের ১৪ লাখের বেশি মানুষকে সংক্রমণ করেছে। আর মৃত্যুর সংখ্যা ৮২ হাজার ছাড়িয়েছে। শুরুতে বাংলাদেশে সংক্রমণের সংখ্যা কম থাকলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই এপ্রিল মাসে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এই ভাইরাসের তান্ডব কত দিন চলবে কেউ ধারণা করতে পারছে না। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আরো অন্তত চার-পাচঁ মাস কোভিড-১৯ এর প্রকটতা থাকতে পারে। সংক্রমণের হার যেভাবে বাড়ছে, তা অতি ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করছে। এই সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে বেশ কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব থেকে উত্তরণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাহাত্তর হাজার সাতশত পঞ্চাশ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজও ঘোষণা করেছেন। ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য গ্রেড ভেদে ৫- ১০ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য বীমা, এবং মৃত্যু বরণ করলে এর পাচঁগুণ পরিমাণ জীবন বীমা সুবিধার ঘোষণাও এসেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা থেকে আমি যা বুঝতে পারছি তা হল- এ সময় সেবা দিতে গিয়ে কেউ আক্রান্ত হলে অথবা মৃত্যু বরণ করলে এই বীমা সুবিধা পাবে।

এমতাবস্থায়, সরকারকে একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। তা নিয়েই এই পর্যালোচনাঃ

এ সংকট মোকাবেলায় সম্মুখ থেকে যেসকল ডাক্তার, নার্স, এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী মূল যুদ্ধটা করছে তাঁদের জন্য মাসিক মহামারীকালীন ভাতা/ ক্রিটিকাল অ্যালাউন্সও চালু করা যেতে পারে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, এবং চীন সরকারও এরকম ভাতা দিচ্ছে। এ ভাতা কেউ সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হলেও পাবে; না হলেও পাবে। অর্থাৎ এটি বীমা সুবিধার মত নয়; বরং মাসিক ভাতা বা প্রণোদনা। তাঁদের যুদ্ধের স্বীকৃতিস্বরুপ একটা অতিরিক্ত সম্মানী - যা মাসের বেতনের সাথে পাবেন। কারণ, কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছেন এই পেশায় নিয়োজিতরা। যদি ধরেও নিই যে, সকল ডাক্তার- নার্সদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা দেয়ার সকল ব্যবস্থা করা হয়েছে, তবুও তাঁদের সার্বিক জীবন ঝুঁকি কতটা তা সদ্য বিশ্বব্যাপী সব উন্নত দেশের ডাক্তারদের মৃত্যুর খবরেই বোঝা যাচ্ছে। আর তাতেই ডাক্তার নার্সরা অনেক ভয়ে আছেন, এমনকি হাসপাতালে যেতেও অনেকে অনীহা প্রকাশ করছেন। এতদিনে আমরা জেনেছি যে, ইতালিতে মোট আক্রান্তদের দশ শতাংশই স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী।

আর বাংলাদেশে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য সহযোগী স্টাফদের সংখ্যা প্রয়োজন অনুপাতে অনেক কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদন্ড অনুসারে একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একজন ডাক্তারের সাথে তিনজন নার্স, ও পাঁচজন টেকনেশিয়ান থাকা উচিত। কিন্ত বাংলাদেশে আছে একজন ডাক্তারের সাথে একজনের সামান্য বেশি নার্স, এবং নার্সের চেয়েও কম টেকনিশিয়ান। এছাড়া এই মানদন্ড অনুসারে প্রতি ১০ হাজার জনগনের জন্য ২৩ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা মাত্র ৭.৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, অনুমোদিত পদের বিপরীতে ডাক্তার পদায়ন আছে মাত্র সাড়ে পঁচিশ হাজার আর নার্স আছে ৩৩ হাজার। এই পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জনবল সংকটের চিত্র ফুটে উঠে। আর জনবল সংকটের কারণেই, যাঁরা কাজ করছে তাঁদের অনেক বেশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অধিকন্তু, করোনার কারণে ডাক্তার-নার্সদের কাজের পরিমাণ বা ওয়ার্ক লোড অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এই প্রণোদনা দিলে তাঁরা সানন্দে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে স্পৃহা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই তাঁদের যুদ্ধে নামানোর জন্য শারিরীক নিরাপত্তার পাশাপাশি সম্পূর্ণ মানসিক (আর্থিক ও পারিবারিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা থেকে মুক্তি দেয়া) নিরাপত্তা দেয়া দরকার। যা জীবন বীমার পাশাপাশি এই মাসিক মহামারীকালীন ভাতা অনেকটাই নিশ্চিত করতে পারে।

পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করলে, এই স্বল্প সংখ্যক স্বাস্থ্য সেবাপ্রদানকারীরাই যদি আশঙ্কায় থেকে দায়িত্ব পালন করে তাহলে পুরো স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থাপনাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তাঁদেরকে আরো উৎসাহিত করতে এই ভাতা দেয়া উচিত। গবেষণা বলছে, আর্থিক ও অ-আর্থিক উভয় ধরণের প্রণোদনা সকল পেশার জনবলের কর্মস্পৃহা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। আর সরকার তখন প্রতিটি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে জবাবদিহিতায় অনেক কঠোর হতে পারে।

উপরিউক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে, মার্চ থেকে যতদিন পর্যন্ত এই মহামারী থাকবে ততদিন পর্যন্ত করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী সকল সরকারি জনবলকে মাসিক হিসেবে মহামারীকালীন ভাতা প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও এই সময়ে সেবা দিতে গিয়ে কেউ সংক্রমিত হয়ে মারা গেলে তাদের পরিবারের সুরক্ষা স্বরূপ জীবন বীমার ব্যবস্থাতো আছেই।

আসুন আমরা এশিয়ার দুটি দেশের উদাহরণ দেখি যারা জীবন বীমার পাশাপাশি মহামারীকালীন ভাতা চালু করেছে তাদের অবস্থা।>

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ইন্দোনেশিয়া সরকার ডাক্তার, নার্স, ডেন্টিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ প্রণোদনার কথা ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের জন্য বাংলাদেশী মুদ্রায় এককালীন ৭৭৬৮০ টাকা, অন্যান্য ডাক্তার ও ডেন্টিস্টদের জন্য ৫১৭৮০ টাকা, নার্সদের জন্য ৩৮৮৪০ টাকা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ২৫৮৯০ টাকার বিশেষ ভাতা ঘোষণা করেছে। এছাড়াও জীবন বীমা সুবিধাতো আছেই। অন্যদিকে মালয়েশিয়া সরকার কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সম্মূখভাগ থেকে যারা স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছেন তাঁদের জন্য সংকটকালীন ঝুঁকি ভাতা হিসেবে মাসিক চারশত মালয়েশিয়ান রিংগিত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশেও করোনা মোকাবেলায় ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এই ধরণের মাসিক প্রণোদনা দিলে কত টাকা লাগবে তার একটা খসড়া হিসাব করে দেখেছি। হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান মোট সরকারি জনবল ১ লাখ ১১ হাজার তিনশত জনকে এই ধরণের মাসিক ভাতা দিলে প্রতি মাসে আনুমানিক ২০ থেকে ২১ কোটি টাকা লাগবে। আমরা যদি ধরে নিই- করোনার প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে আরো ৫ মাস থাকবে তাহলে সর্বমোট আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা মত প্রয়োজন হবে। যেহেতু এই বিশেষ ভাতা শুধুমাত্র তত দিনই দেয়া লাগবে যতদিন বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব থাকবে, তাই প্রাদুর্ভাবের সময়ের তারতম্যের সাথে এই ভাতার মোট পরিমান কম-বেশি হবে। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে, বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় ১ম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে যত ধরণের ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য সাপোর্টিং স্টাফ কর্মরত আছে, তাদের মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হিসাবে এই মাসিক ভাতা হিসাব করা হয়েছে। আর এই শতাংশের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে অন্যান্য দেশের ভাতার পরিমাণ বিশ্লেষণ করে। তবে আরো বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে এই শতাংশের হার চূড়ান্ত করা যেতে পারে।

ভাতার এই অর্থ চলতি অর্থ বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ দুইলক্ষ দুই হাজার সাতশ একুশ কোটি টাকা হতে স্বাস্থ্যখাতের জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ আছে - সেটার অ-ব্যয়িত অংশ থেকে যোগান দেয়া যেতে পারে।

মাত্র ৮০-১০০ কোটি টাকা প্রদানের বিনিময়ে যাঁরা জীবন বাজি রেখে আমাদের সুরক্ষার জন্য করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, তাঁদেরকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ রয়েছে। এই অনুপ্রেরণা সরকার কেন দিবে না?

কেন সব মানুষ হাসিমুখে আরো বেশি ডাক্তারেদের সুবিধার বিষয় মেনে নেবে না? আমি যাহার মন-প্রাণ জুড়ানো ভালোবাসা চাইবো তাহারে ততোটাই ভালোবাসিতে হইবে প্রতিদানে। পরিশেষে, ইতোমধ্যে নেয়া সকল প্রশংসনীয় উদ্যোগের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে এ প্রশ্নটা রাখতেই পারি নীতি নির্ধারকদের কাছে।

 

[ মোঃ রেজাউল আজিম 
প্রভাষক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

Articles by DU Researchers