করোনা নিয়ে কিছু কথা

করোনা যুদ্ধে যে সকল বীর সৈনিক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন তাঁদের প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং অকুন্ঠ অভিনন্দন। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা যেন সকলকে রক্ষা করেন এই কামনা করি। একই সাথে করোনা প্রতিষেধক উদ্ভাবনে বিশ্বের যে সকল বিজ্ঞানী নিরলস গবেষণারত তাঁদের প্রতি রইল আন্তরিক অভিবাদন। 

‘করোনা’ একটি ভাইরাস এটি এতদিনে সকলে জেনে গেছেন। আমিও কিছুটা জানি। আজ করোনা নিয়েই লিখছি। ভাইরাস জিনিসটি আসলে কি? ভাইরাস হলো প্রোটিন আবৃত একটি নিউক্লিক এসিড (ডি এন এ অথবা আর এন এ)। কেন্দ্রে নিউক্লিক এসিড এবং বাইরের প্রোটিন আবরণ ছাড়াও অনেক সময় লিপিড, লিপোপ্রোটিন বা শর্করার একটি অতিরিক্ত আবরণ থাকতে পারে। প্রোটিন ছাড়াও করোনাতে একটি অতিরিক্ত লিপিডের আবরণ আছে বলে জেনেছি। ভাইরাস অতি আণুক্ষণিক যা শুধুমাত্র জীবদেহের অভ্যন্তরে সক্রিয় হয়ে রোগ সৃষ্টি করে। জীবদেহের বাইরে এটি লবণ বা চিনির দানার মতই একটি জড় পদার্থ। এই জড় ড্রপলেট পদার্থের কারণেই রোগটি এত ছোঁয়াচে। সাধারণত প্রাণীদেহে আক্রমণকারী ভাইরাসগুলোর নিউক্লিক এসিড হলো ডি এন এ কিন্তু করোনা একটি আর এন এ ভাইরাস। ইতোমধ্যে ভাইরাসজনিত অনেক রোগের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটেছে যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, বসন্ত, পোলিও ইত্যাদি। নতুন করে আমাদের সামনে মূর্তিমান দানব ‘করোনা’ ভাইরাস। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের একজন অধ্যাপক বলছিলেন যে “করোনা ভাইরাস এ পর্যন্ত প্রায় ১১ বার তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করেছে”। তথ্যটি ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। এই পরিবর্তনকে আমরা বিজ্ঞানের ভাষায় মিউটেশন বা পরিব্যক্তি বলি। ভাইরাসের মিউটেশন ঘটে এবং তা ঘটলে অনেকসময় মারাত্মক হতে পারে। প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত থেকে তিনি ধারণা করছেন যে আমাদের দেশের করোনার সাথে চীনের উহানের নয়, ইতালির করোনার মিল রয়েছে। এ থেকে বোঝা গেল উহান থেকে ইতালি যেতে এর পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটেছে।

মিউটেশন হলো জীবদেহের একটি লক্ষণীয় বংশগতীয় পরিবর্তন। সাধারণত জীবাণু দুধরনের হতে পারে; একটি মৃদু এবং অন্যটি মারাত্মক। মিউটেশনের মাধ্যমে জীবাণুর সেই মারাত্মকতা বৃদ্ধি পেতে পারে। তিনটি যৌগ (নাইট্রোজেন বেইস, পেন্টোজ সুগার এবং ফসফেট) দিয়ে বংশগতীয় বস্তু ‘নিউক্লিক এসিড’ গঠিত। এর মধ্যে নাইট্রোজেন বেইসটিতে পরিবর্তন ঘটলে সাধারণত মিউটেশন ঘটে থাকে। করোনার নিউক্লিক এসিডের বেইস পর্যায়ে একাধিকবার পরিবর্তন ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। মানবদেহে রোগ সৃষ্টির জন্য রোগজীবাণু এবং তার মিউটেশনের যেমন ভূমিকা আছে ঠিক তেমনই মানুষেরও ভূমিকা রয়েছে। জীবাণু এবং মানুষের মধ্যে সবসময় একটি অলিখিত যুদ্ধ চলে। মানুষ জিতলে রোগ হবে না আর জীবাণু জিতলে রোগ হবে। যুদ্ধ জয়ের জন্য সুষম খাদ্যপুষ্টি গ্রহণ এবং মানসিক মনোবল বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে রোগপ্রতিরোধ বা রোগের তীব্রতা কমিয়ে দেয়ার রণকৌশল অবলম্বন করতে হবে। 

এই বিভীষিকাময় করোনার ভয়াল থাবা থেকে মুক্তি পেতে হলে এর পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে। সেই পরিত্রাণের দায়িত্ব স্বভাবতই বিজ্ঞানীদের উপরই বর্তায়। তাইতো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিজ্ঞানীরা সেই পরিত্রাণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন। এখনই তেমন সুখবর নেই। আমরা প্রতিনিয়ত সে সুখবরের অপেক্ষায় আছি। সেই অপেক্ষার মাঝেই ইতিহাসের পাতা থেকে প্রাতঃস্মরণীয় বিজ্ঞানীদের কিছু উল্লেখযোগ্য অবদানের কথা স্মরণ করে আশায় বুক বাঁধবো। আমরা সকলে করোনার টিকা কথা ভাবছি। টিকার কথা ভাবতে গেলেই প্রথমেই স্মরণ করতে হয় ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনারকে যিনি ‘গুটি বসন্ত’-এর টিকা আবিষ্কার করে বসন্তের মহামারী ঠেকিয়েছেন। জেনারের মত ফরাসী বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ‘র‍্যাবিস’ ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে জলাতঙ্কের মূর্তিমান আতঙ্ককে থামিয়েছেন। দুজন ফরাসী বিজ্ঞানী আলবার্ট ক্যামেট্টি এবং ক্যামিলে গুয়েরিন বি সি জি টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে মহামারী যক্ষ্মা থেকে আমাদের রক্ষা করেছেন। জার্মানী বিজ্ঞানী পল আরলিখ ‘ম্যাজিক বুলেট’ আবিষ্কার করে সিফিলিসকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। স্কটিস বিজ্ঞানী স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ‘পেনিসিলিন’ নামক এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নব দিগন্তের সূচনা করেছেন। তাঁদের সে অবদান আমরা সবসময়ই কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। করোনার মহামারীতেও বিশ্বের সকল কৃতি বিজ্ঞানী মানুষকে রক্ষার উপায় খুঁজতে নিরলস গবেষণারত। ইতিহাস বলে মানুষ পরাজিত হয় না। এবারও হবে না। মহান সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আমাদের সহায় হবেন। সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

ড.  মিহির লাল সাহা
অধ্যাপক
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুক পোষ্টঃ ২০ এপ্রিল, ২০২০

Articles by DU Researchers