জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘‘বিশ্ব আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সপ্তাহ-২০২৬’’ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ কেন্দ্র এবং বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে অদ্য ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ রবিবার সকাল ৯:৪৫ মিনিটে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে থেকে এই র্যালিটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে, আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, আজকের এই র্যার্লি শুধু একটি কর্মসূচিই নয়, এটি একটি বার্তা। বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মের মানুষের এক্যবদ্ধ কর্মসূচী এই বার্তাই বহন করে যে, আমারা বিভাজনে বিশ্বাস করিনা, আমরা ঘৃণায় বিশ্বাস করি না, আমরা বিশ্বাস করি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধে। দেশের অন্যতম প্রবীণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অমাদের দায়িত্ব হলো জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সহনশীল, উদার ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন নাগরিক তৈরি করা। তরুন প্রজন্ম যেভাবে সম্প্রীতির চর্চায় এগিয়ে এসেছে, তাতে আমারা আশা করতে পারি, ভবিষৎ বাংলাদেশ হবে আরও শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও মানবিক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তাব্যে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের অগে আমরা সবাই মানুষ। আমাদের বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানবিকতা এক ও অভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই চেতনার ধারক, যেখানে ভিন্নতাকে বিভেদ নয় বরং সৌন্দর্য হিসেবে দেখে। আজকের এই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি র্যালি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মাধ্যমেই একটি উন্নত সমাজ গড়ে উঠতে পারে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম বলেন, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সহযোগিতাই পারে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে। আসুন, আমরা সবাই মিলে ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মানবিক, ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনে অঙ্গীকারাবদ্ধ হই। অনুষ্ঠানের সভাপতি আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, বাংলাদেশে আমাদের যা কিছু, অর্জন আছে তার মূলে রয়েছে সকল ধর্মের মানুষের ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুথান, এই সবগুলোই অর্জিত হয়েছে সকল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে, তাই বিভাজন নয়, ঐকই আমাদের শক্তি। বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোঃ আবু সায়েম বলেন, বিশ্বের সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসা, শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। ধর্ম কখনো বিভেদের কারণ হতে পারে না; বরং ধর্ম মানুষের মাঝে সৌহার্দ্য ও মানবিক বন্ধন দৃঢ় করে। তাই ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজন সৃষ্টি করা নয়, বরং ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে আমাদের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতির সভাপতি অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, আজকের এই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি র্যালি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে নানা ধর্ম, নানা সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করছে। এই সহাবস্থানই আমাদের জাতিগত পরিচয়। আর এটাই আমাদের শক্তি। বাংলাদেশ ক্যাথলিক পুরোহিত ও বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. ফাদার তপন কামিলুস ডি’ রোজারিও বলেন, বাংলাদেশে নানা ধর্ম, সংস্কৃতি ও নৃগোষ্ঠীর লোক বাস করে। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও আন্তরিকতপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে। খ্রিষ্টধর্ম ও আমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, ক্ষমা ও শান্তির কথা বলে। আমরা বাংলাদেশকে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ক্ষেত্রে আরো অনন্য উচ্চতায় দেখতে চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ সহ অন্যান্য বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা কর্মচারী ছাড়া ও উক্ত র্যালিতে বাংলাদেশের যে সকল সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন সেগুলো হলো- রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, বাংলাদেশ গীতা সংঘ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি, বাংলাদেশ গীতা পরিষদ, শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু মহাপ্রকাশ মঠ, হাক্কানি আঞ্জুমান বাংলাদেশ, আন্তজার্তিক বৌদ্ধ বিহারের প্রতিনিধিবৃন্দ ও বাংলাদেশ বাহাই সম্প্রদায় ও গুরুদুয়ারা নানকশাহী থেকে আগত শিক সম্প্রদায়ের সদস্যবৃন্দ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ছাত্র-উপদেষ্টা ড. মো. দিদারুল ইসলাম। এ আয়োজনের মাধ্যমে একটি বহু ধর্মীয় ও বহু সাংস্কৃতিক সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহিষ্ণুতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী প্রচার করাই ছিল এ-র্যালির মূল উদ্দেশ্য।