‘ভবিষ্যৎ আপনাদের, দেশ গড়ার নেতৃত্বও আপনাদের নিতে হবে’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বর্তমান তরুণ প্রজন্মের হাতে। অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে পড়ে না থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, আমি যতটা বলতে চাই, তার চেয়ে বেশি আমি শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে চাই। ভবিষ্যৎ আপনাদের; দেশকে এগিয়ে নিতে আপনাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে।
আজ ১২ মে ২০২৬, মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ও সাদা দলের আহ্বায়ক ড. মোর্শেদ হাসান খান। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহাদী আলম-সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাবৃন্দ। সঞ্চালনা করেন জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ্ আল মামুন।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবং সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন।
মতবিনিময়কালে শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকট, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও হলের রিডিং রুমে আসনসংকট, সরকারি চাকরিতে অনিয়ম, গবেষণায় সীমাবদ্ধতা, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা, ভাষাশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল শিল্পের বিকাশসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন। এসব প্রশ্নের খোলামেলা উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়ম দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বড় বড় প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে তিনি দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, সে জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
গবেষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ গবেষণা ও মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগে ঘাটতি। মেধা ও একাডেমিক যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ এবং গবেষণা সংস্কৃতি জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের গবেষণা ও উদ্ভাবনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষার্থীদের ভাষা শিক্ষা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার স্কুল পর্যায় থেকেই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। ইংরেজির পাশাপাশি চীনা, জাপানি, ফরাসি, জার্মানসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ভাষা শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সৃজনশীল চর্চাকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে স্কুল পর্যায় থেকেই ভাষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার, ভাষাভিত্তিক বিষয়সমূহে সরকারি চাকরিতে কোড অন্তর্ভুক্তি, সৃজনশীল শিল্পের বিকাশ এবং জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন বিভাগ চালুর দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উপাচার্য বলেন, ভাষা আন্দোলন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও জাতীয় আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ আগমন ইতিহাসে একটি অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘হিজবুল বাহার’ কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তা, পরামর্শ ও মেধাকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী যে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন, আজকের এই মতবিনিময় অনুষ্ঠান সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের মতো শিক্ষকদের সঙ্গেও একটি পৃথক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষকবৃন্দ তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামতের মাধ্যমে দেশ গঠনের কার্যক্রমে আরও কার্যকর অবদান রাখতে পারবেন।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী এবং সাদা দল-এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এমন উন্মুক্ত সংলাপ দেশের উচ্চশিক্ষা ও গণতান্ত্রিক চর্চায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও প্রধানমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ ধরনের মতবিনিময়ে অংশ নেবেন।
এর আগে, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ট্রান্সফর্মিং হাইয়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্সি’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কর্মশালার উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিনসহ জাতীয় অধ্যাপক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, গবেষক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও উন্নয়ন সহযোগীরা। কর্মশালাটির আয়োজন করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে টেকসই উৎকর্ষতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে কাক্সিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু প্রথাগত শিক্ষায় নয়, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে গবেষণা প্রকাশনা, সাইটেশন এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে প্রাক্তন শিক্ষার্থী বা অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ত করারও আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেকেই বেকার থেকে যাচ্ছেন। এ বাস্তবতায় সরকার শিক্ষা কার্যক্রমকে সময়োপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠক্রম পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়নে সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদানের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইনোভেশন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিজ্ঞান মেলা, ইনোভেশন ফেয়ার এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষামূলক আয়োজন বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও উদ্যোক্তা মানসিকতা বিকশিত হয়।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন, বায়োটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ন্যানোটেকনোলজির মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানচর্চা আর একক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ডাটা সায়েন্স, বায়োলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও সমাজবিজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়োগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের মেধাবী তরুণদের যথাযথ সুযোগ ও সহায়তা প্রদান করা গেলে তারাও বিশ্বমানের নতুন উদ্ভাবন করতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জনের পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিকালে কর্মশালার সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে এসময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম বদরুজ্জামান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আখতার হোসেন খান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, উচ্চ শিক্ষা কেবল চাকরি অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক শক্তি, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন, নৈতিক নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি। বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সৃজনশীলতা, গবেষণা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং জাতীয় সমস্যার উদ্ভাবনী সমাধানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
উপাচার্য বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা ও জনসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশকে জ্ঞান গ্রহণকারী জাতি থেকে জ্ঞান সৃষ্টিকারী জাতিতে পরিণত হতে হবে। এ লক্ষ্যে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, উচ্চ শিক্ষার উন্নয়নে পর্যাপ্ত অর্থায়ন অত্যন্ত জরুরি। গবেষণা, শিক্ষা পরিবেশ এবং গবেষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার সমন্বয়ের মাধ্যমেই দেশের উচ্চ শিক্ষায় কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা মজবুত হলে মাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার ভিত্তিও সুদৃঢ় হবে। তিনি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে আরও গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

১২-০৫-২৬
ফররুখ মাহমুদ
উপ পরিচালক
জনসংযোগ দফতর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।